
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল: দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তার প্রকৃত পরীক্ষা শুধু জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে নয়, জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমেও প্রতিফলিত হয়। একজন নাগরিক রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন তার নিজের ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা কিংবা পৌর এলাকার সেবা পাওয়ার মধ্য দিয়ে। রাস্তা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি, স্থানীয় বাজার, নাগরিক সেবা, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পথচারী নিরাপত্তা কিংবা স্থানীয় অবকাঠামো, এসব বিষয় সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। আর এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতা যত বেশি, জনগণের কাছে রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতাও তত বেশি।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সারাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে এবং প্রথম ধাপের সম্ভাব্য ভোট ১২ নভেম্বর থেকে শুরু হতে পারে। পরবর্তী ধাপগুলোও পর্যায়ক্রমে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। তবে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামতের পর সময়সূচি চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাচন আয়োজনের এই উদ্যোগ শুধু একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়, এটি দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে সক্রিয় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কারণ একটি ইউনিয়ন পরিষদ কেবল চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান নয়। এটি গ্রামীণ জনগণের দৈনন্দিন নাগরিক সেবা, স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসম্পৃক্ত প্রশাসনের অন্যতম প্রধান স্তর। তাই এই নির্বাচন যতটা গুরুত্বপূর্ণ ভোট দেওয়ার জন্য, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যকর, সৎ, দায়িত্বশীল ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার গঠনের জন্য।
তবে নির্বাচন হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সুষ্ঠু নির্বাচন একটি কার্যকর স্থানীয় সরকারের প্রথম শর্ত মাত্র। নির্বাচনের আগে যেমন প্রার্থীদের আচরণ, প্রচার ও অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি ভোটের দিন ভোটারের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রার্থী যাতে ভয়ভীতি, প্রভাব, অর্থবল, পেশিশক্তি কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে ভোটের পরিবেশ নষ্ট করতে না পারেন, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো ভোটার যেন নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কারণে হয়রানি বা চাপের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা নির্বাচন ব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্ব।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে শুধু স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হবে। জাতীয় রাজনীতির বাইরে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সবচেয়ে কাছের জায়গাগুলোর একটি হলো স্থানীয় সরকার। এখানে একজন ভোটার তার এলাকার রাস্তা, পানি, ড্রেনেজ, বাজার, সড়ক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা সামাজিক সমস্যার বিষয়ে যিনি সিদ্ধান্ত নেবেন, তাকে নির্বাচিত করেন। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মীয়তা বা সাময়িক আবেগের পাশাপাশি প্রার্থীর সততা, দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা, দায়িত্বশীলতা এবং এলাকার উন্নয়ন সম্পর্কে বাস্তব ধারণাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এখানেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি শুধু নির্বাচন চাই, নাকি কার্যকর স্থানীয় সরকারও চাই? যদি দ্বিতীয়টি চাই, তাহলে নির্বাচনের পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও ক্ষমতার বাস্তব পরিধি নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম সমস্যা হলো দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে অসামঞ্জস্য। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর অনেক দায়িত্ব রয়েছে, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, দক্ষ জনবল, কারিগরি সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে নেই।
একটি ইউনিয়ন পরিষদকে রাস্তা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় অবকাঠামো কিংবা নাগরিক সেবা নিয়ে কাজ করতে বলা হলো। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ নেই, কারিগরি জনবল সীমিত, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্য দপ্তরের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। তখন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ জনপ্রতিনিধিরাও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন না। ফলে জনগণের প্রত্যাশা ও স্থানীয় সরকারের সক্ষমতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, এটি জবাবদিহির কাঠামোগত সংকট। কারণ জনগণ যার কাছে অভিযোগ করছেন, তার হাতে যদি সমস্যার সমাধানের পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকে, তাহলে জবাবদিহির কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমেই দায়িত্বের সঙ্গে ক্ষমতা এবং ক্ষমতার সঙ্গে সম্পদ দিতে হবে।