Home জেলার খবর শবে বরাত কী ও তার করণীয় বর্জনীয় ।

শবে বরাত কী ও তার করণীয় বর্জনীয় ।

43
0
SHARE

শবে বরাত কী ও তার করণীয় বর্জনীয় ।
হাফেজ মাওঃ নাজমুদ্দীন বিন মুখলিছ

(আল আমিন বিন আমজাদ)

شب برات ٓশবে বরাত শব্দটি ফারসি। শব অর্থ হলো রাত বা রজনী; আর বরাত মানে ভাগ্য। একত্রে শবে বরাতের মানে ভাগ্য রজনী। আবার আরবিতে বলা হয় লাইলাতুল বারাআত। লাইলাতুন অর্থ হলো রাত আর বারাআতুন অর্থ হলো মুক্তি। একত্রে অর্থ হলো মুক্তির রাত।

বর্তমান সময়ে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির কবলে পড়েছে শবে বরাত। কেউ বলেন, শবে বরাত বলতে ইসলামে কিছুই নেই। আবার অনেকে মসজিদে সমবেতভাবে ইবাদত-বন্দেগিতে রাত অতিবাহিত করে থাকে। আবার অনেকে এ রাতে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান উদযাপন করেন।

অথচ শবে বরাত বলতে ইসলামে শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে বুঝায়। হাদিসে এ রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বলে উল্লেখ হয়েছে।

প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাতে নিজ গৃহে ইবাদত-বন্দেগিতে রাত কাটিয়েছেন। যদিও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাসগৃহ আর মসজিদে নববি এক সঙ্গেই ছিল। তথাপিও তিনি নিজ গৃহে নফল ইবাদাত-বন্দেগি করেছেন।

তবে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসের আলোকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’তথা শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতের ফজিলতকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

শবে বরাত নিয়ে বাড়াবাড়ি করা যেমন ঠিক নয়; তেমনি ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’-এর ব্যাপারে অবহেলাও ঠিক নয়। কারণ হাদিসে এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিক নির্দেশনা রয়েছে।এ রাতে আল্লাহ তাআআ মুশরিক এবং বিদ্বেষী ব্যতিত সব অপরাধীকে ক্ষমা করে দেন। হজরত মুআয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে হিব্বান)

আজকাল শবে বরাতকে ঘিরে কিছু কুসংস্কারমূলক প্রথা প্রচলিত রয়েছে আমাদের সমাজে; যেমন আতশবাজি ও পটকাবাজি করা, হালুয়া-রুটির আয়োজনকে বাধ্যতামূলক ভাবা, মসজিদে আলোকসজ্জা করা, আনন্দ-উল্লাস করে হালুয়া-মিষ্টি বিতরণ করা, বাড়ি বাড়ি খিচুড়ি বন্টন করা, কবরস্থানে পুষ্প অর্পণ করা।  এসব থেকে বিরত থাকা চাই। কারণ কুরআনও হাদিসের কোথাও এগুলির বৈধতা নেই। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন,যখন শাবানের মধ্যবর্তী রাত আসে, তখন তোমরা রাত জেগে নামাজ, তসবিহ, দরুদসহ অন্যান্য ইবাদতবন্দেগিতে মগ্ন থাকো। সঙ্গে পরের দিন রোজা রাখো। (সুনানে ইবনে মাজাহ)।

আল্লাহ তায়ালা এ রাতে প্রথম আসমানে অবতরণ করেন। এরপর বান্দাদেরকে ডাকতে থাকেন, আছে কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থী, যাকে আমি ক্ষমা করবো? আছে কি কোনো রিজিক অন্বেষণকারী, যাকে আমি রিজিক দান করবো? আছে কি কোনো বিপদগ্রস্ত, যার আপদ আমি দূর করে দেবো? (সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৮৮)। এভাবে সুবহে সাদিক অবধি সব শ্রেণির বান্দাদেরকে বড় মায়া করে নাম ধরে ধরে তিনি ডাকতে থাকেন এবং ক্ষমা করতে থাকেন। তবে বিভিন্ন হাদিসসূত্রে জানা যায়, বিশেষ কিছু শ্রেণির লোকদেরকে তিনি ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না তারা খাঁটি অন্তরে তওবা করে সৎপথে ফিরে আসে। এমন শ্রেণির সংখ্যা প্রায় এগারো ১. মুশরিক তথা ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহর সঙ্গে যেকোনো ধরনের শিরকে লিপ্ত। ২. ঐ লোক, যে কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। ৩. ঐ ব্যক্তি, যে অপরের কোনো কল্যাণ দেখতে পারে না তথা পরশ্রীকাতরতায় লিপ্ত।  ৪. সেই লোক, যে আতœহত্যা করার চেষ্টা করে।  ৫. সেই ব্যক্তি, যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে; চাই তা নিকটতম আত্মীয় হোক কিংবা দূরবর্তী।  ৬. ঐ ব্যক্তি, যে ব্যভিচারে লিপ্ত। ৭. সেই লোক, যে মদপানকারী তথা নেশাখোর।  ৮. ঐ ব্যক্তি, যে গণকগিরি করে বেড়ায় বা গণকের কাছে আসা-যাওয়া করে।  ৯. সেই লোক, যে মাতাপিতার অবাধ্য। ১০. ঐ লোক,যে জুয়াখেলায় লিপ্ত এবং ১১. টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী পুরুষ। (সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৬৬৫, আল মুজামুল কাবির ২০/১০৯, শোয়াবুল ইমান : ৬৬২৮)।

শবে বরাতের পূর্ণ ফজিলত ও সে রাতে দোয়া কবুল হওয়ার জন্য এসব কবিরা গোনাহ থেকে খাঁটি দিলে তওবা করে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করা আবশ্যক।

শবে বরাতের পরদিন রোযা রাখার কোন ফজিলত আছে কী

শা’বানের এক তারিখ থেকে সাতাইশ তারিখ পর্যন্ত রোযা রাখার বিশেষ ফযীলতের কথা হাদীস শরীফে আছে। তাছাড়া আইয়ামে বীয তথা প্রতি মাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখে রোযা রাখার ব্যাপারে হাদীস শরীফে উৎসাহিত করা হয়েছে। সেই সাথে যয়ীফ সনদে বর্ণিত একটি হাদীসে বিশেষভাবে পনেরো তারিখের রোযা রাখার নির্দেশনাও পাওয়া যায়।

হাদিসে আছে, ‘পনেরো শা’বানের রাত (চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা তা ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও এবং পরদিন রোযা রাখ।’ সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস : ১৩৮৪

যেহেতু বিভিন্ন সহীহ হাদীসে শা’বান মাসের রোযার সাধারণ ফযীলত এবং আইয়ামে বীযের রোযার ফযীলত উল্লেখিত হয়েছে পাশাপাশি যয়ীফ সনদে উপরোক্ত হাদীসটিও বিদ্যমান রয়েছে তাই কেউ যদি এই সকল বিষয় বিবেচনায় রেখে পনেরো শা’বানের রোযা রাখেন তাহলে তিনি সওয়াব পাবেন ইনশাআল্লাহ।

শবে বরাতে রাতের গোসলের প্রতিটি ফোটায় ৭০ রাকাতের সওয়াব : ভিত্তিহীন কুসংস্কার

শাবানের ১৫ তারিখের রাতের বিষয়ে আরেকটি ভিত্তিহীন কুসংস্কার সমাজে প্রচলিত আছে। সেটি শবে বরাতের রাতের গোসল কেন্দ্রিক। এই রাতে ইবাদতের উদ্দেশে যদি কেউ গোসল করে তাহলে তার গোসলের প্রতি ফোটার বিনিময়ে গুনাহ মাফ হবে। আবার কেউ কেউ কথাটি এভাবে বলে যে, প্রতি ফোটায় ৭০ রাকাত নফল নামাযের সওয়াব হবে।

যেভাবেই বলা হোক না কেন  এটি একটি জাল বর্ণনা বা ভিত্তিহীন কথা ,কুরআন হাদীসে যার কোন প্রমাণ নেই। এ রাতে শুধু নফল ইবাদাত করতে বলা হয়েছে। কুরআন তেলাওয়াত , যিকির-আযকার , সালাতুত তাসবীহ ,দুরুদ পাঠ ইত্যাদি নফল ইবাদাতের মাধ্যমে এই মহিমান্বিত রজনী অতিবাহিত করতে হবে। আমাদেরকে  এ ধরনের জাল বর্ণনা ও ভিত্তিহীন কথা ও কাজ  থেকে বিরত থাকতে হবে  এবং ফযীলতের প্রতিটি বিষয়কে তার গন্ডির মধ্যে রেখে তাকে কাজে লাগাতে হবে।

এটি হাদীস নয় : ‘শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাবে’

একটি গ্রামের নারীদের প্রায় সকলকেই বলতে শোনা গেছে, ‘শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাওয়া যাবে।’ এটিকে রাসূলের হাদীস হিসেবেই বলা হয়েছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের সাথে এর দূরতম সম্পর্কও নেই।

এটি এমন একটি ভিত্তিহীন কথা যার জাল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এমনকি জাল হাদীসের উপর লেখা কিতাবাদিতেও এর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।

কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, ওহুদ যুদ্ধে যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানদান মোবরক শহীদ হয়েছিল, তখন কিছুদিন কোনো প্রকার শক্ত খাবার খেতে পারতেন না। সেই ঘটনার প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এই দিনে ঘটা করে হালুয়া রুটি খাওয়া হয়। কিন্তু ওহুদ যুদ্ধ তো শাবান মাসের ১৫ তারিখে হয়নি তা হয়েছে শাওয়ালের ৭ তারিখে। সুতরাং যদি সে কেন্দ্রিক কোনো বিষয় থাকত তাহলে তা শাওয়াল মাসের ৭ তারিখে থাকত শাবানের ১৫ তারিখে নয়।

শাবানের পনের তারিখের রাতের ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস ৫৬৬৫; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ৩৮৩৩) কিন্তু এই রাতের সাথে হালুয়া-রুটির কী সম্পর্ক?

এ রাতের যতটুকু ফযীলত প্রমাণিত আছে শুধু ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। রসম-রেওয়াযের পিছে পড়ে এর মূল ফযীলত থেকে বঞ্চিত হওয়া ঠিক নয়।

আর আলোচ্য বিষয়টি মূলত এই রাতের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন রসমের অন্যতম, যার কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরণের কাজ এবং এ রাত কেন্দ্রিক আরো যত রসম-রেওয়ায আছে এগুলে থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

আর এ ধরনের ভিত্তিহীন কথাকে রাসূলের হাদীস হিসেবে বলা অনেক মারাত্কত গুনাহের কাজ। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। দ্বীনের সকল বিষয়ে সহীহ কথা ও সহীহ কাজ করার তাওফিক দিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here