Home রাজনীতি বাংলাদেশের ক্ষমতার চাঞ্চল্যকর তথ্য

বাংলাদেশের ক্ষমতার চাঞ্চল্যকর তথ্য

42
1
SHARE

0,,17045158_304,00আড়াই লাখ মার্কিন তারবার্তা ফাঁস করে সারাবিশ্বে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস। মার্কিন কূটনীতিকদের ভাষ্যে এসব তারবার্তায় বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার অন্দরমহলের চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। ওয়াশিংটনে পাঠানো মার্কিন কূটনীতিকদের পাঠানো তারবার্তাগুলোর সত্যতা কতটুকু না নিয়ে সব মহলে প্রশ্ন থাকলেও এ নিয়ে গোটা দেশেই রীতিমতো তোলপাড় চলছে।
তবে ওয়ান ইলেভেনের মতো মার্কিন কূটনীতিকদের প্রেরিত তারবার্তায় রাজনীতিকদের চরিত্র হননই যে প্রধান টার্গেট ছিল, সে ব্যাপারে জনমনে কোন সন্দেহ নেই। তবে ওয়ান ইলেভেনের নেপথ্যের কুশীলব, ষড়যন্ত্রকারীদের সম্পর্কে মার্কিন কূটনীতিকদের তারবার্তায় তেমন কিছু না থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তারবার্তার অনেক কিছুই বলা চলে ‘ওপেনসিক্রেট’ দেশের মানুষ আগে থেকেই অবগত এবং এসবের অনেকটাই বিচ্ছিন্নভাবে মিডিয়াতে ছাপা হয়েছে। দীর্ঘ বছর পর আবারও নতুন করে এসব তথ্য প্রকাশ নিয়েও চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। মার্কিন কূটনীতিকদের তারবার্তায় প্রকাশের রাজনীতিকদের চরিত্র হনন, রাজনীতিবিদ সম্পর্কে জনমনে বিভ্রানত্মি সৃষ্টি করতে পুরনো তথ্য নতুন করে ফলাও প্রকাশ করার পেছনে গণতন্ত্রবিরোধী সুদূরপ্রসারী কোন পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র থাকার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক সম্পর্কসহ নানা বিষয়ে পর্যবেৰণ ও মন্তব্য রয়েছে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের। সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস ফাঁস করে দেয়া এসব তারবার্তায়। ডিজিএফআইর অনেক উদ্যোগ সমর্থন করেননি তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার পর নিজ সরকারের ভাগ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও নিয়ন্ত্রণ গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে, ‘কুখ্যাত দুর্নীতিবাজ’ পুত্র তারেক রহমানকে রৰা করাই খালেদা জিয়ার পতনের মূল কারণ, এমন বহু ঘটনা উঠে এসেছে মার্কিন দূতাবাসের তারবার্তায়।
অবশ্য গত কয়েকদিনে উইকিলিকসের ফাঁস করা মার্কিন কূটনীতিকদের ওয়াশিংটনে পাঠানো গোপন তারবার্তায় রাজনীতিবিদ ছাড়া অন্য কারোর সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তারবার্তায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, সত্য কথা বলার লোক নেই শেখ হাসিনার পাশে। দলীয় লোকদের চেয়ে তিনি পরিবারের সদস্যদের প্রতিই বেশি নির্ভরশীল ও বিশ্বাস করেন। সংস্কারবাদীর কারণে তিনি দলের বড় বড় নেতাকে বাদ দিয়ে ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী তাঁর মুক্তির জন্য কাজ করা নেতাদেরই সরকার ও দলে ঠাঁই দিয়েছেন। বিডিআর বিদ্রোহের পর সরকারের ভাগ্য নিয়েই শঙ্কিত ছিলেন শেখ হাসিনা। তবে বিডিআর বিদ্রোহের পর মন্ত্রিসভার বারণ সত্ত্বেও সেনানিবাসে শেখ হাসিনার গমন এবং অধিক রক্তৰয় এড়িয়ে শেখ হাসিনার নেয়া পদৰেপের প্রশংসার কথা অবশ্য পাঠানো গোপন তারবার্তায় উলেস্নখ করতে ভুল করেননি মার্কিন কূটনীতিক।
বিরোধী দলের নেতা ও বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি (খালেদা) বিচ্ছিন্ন, অলস ও অশিৰিত। ‘কুখ্যাত দুর্নীতিবাজ’ পুত্র তারেক রহমানকে রৰা করাই ছিল তাঁর পতনের মূল কারণ। তাঁর পুত্র তারেক রহমান সম্পর্কে বলা হয়েছে- খালেদার ‘কুখ্যাত’ বড় ছেলে তারেক রহমান নির্দয়, অতিমাত্রায় দুর্নীতিগ্রস্ত, রাজনীতি ও ব্যবসায় অনভিজ্ঞ ও স্বল্পশিক্ষিত। কী করে ছেলে তারেকের দুর্নীতি সামাল দিতে মা খালেদা জিয়া ব্যর্থ হয়েছেন এবং তারেক রহমানের সঙ্গে জঙ্গী কানেকশনের কথাও উঠে এসেছে মার্কিন কূটনীতিকদের পাঠানো তারবার্তায়। বিডিআর বিদ্রোহের পর মার্কিন দূতাবাস থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে জাতীয় ঐক্যের তাগিদ দেয়া হলেও খালেদা জিয়ার অপারগতা প্রকাশ এবং ৰমতায় থাকতে তাঁর (খালেদা জিয়া) ১৭ ঘনিষ্ঠ নেতা-মন্ত্রীর দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্যও সে সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত যেসব তথ্য তারবার্তার মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলেন, সেসব চাঞ্চল্যকর তথ্যও ফাঁস করেছে উইকিলিকস।
দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোঃ জিলস্নুর রহমান সম্পর্কে মার্কিন দূতাবাসের তারবার্তায় বলা হয়েছে, দলের প্রতি তাঁর (জিলস্নুর রহমান) দীর্ঘদিনের অবদান এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেন শেখ হাসিনা। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে শেখ হাসিনা গ্রেফতার হওয়ার পর জিলস্নুর রহমান বিশ্বসত্মতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া শেখ হাসিনার সঙ্গে মোঃ জিলস্নুর রহমানের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এবং তাঁর মরহুমা স্ত্রীর এক আত্মীয় শেখ রেহানাকে বিয়ে করেছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সম্পর্কে তারবার্তায় বলা হয়েছে, সৈয়দ আশরাফ ছিলেন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইর সঙ্গে প্রধান মধ্যস্থতাকারী। শেখ হাসিনার কারাবাসের সময় বিভক্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ রাখার পুরস্কার হিসেবে তাঁকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী করা হয়।
তারবার্তায় শেখ হাসিনার অবিশ্বসত্ম নেতাদের তালিকায় উঠে এসেছে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম। শেখ হাসিনা কেন তাঁদের দূরে সরিয়ে দিয়েছেন এ বিষয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনকে জানান, এসব নেতা শেখ হাসিনা কারাগারে থাকার সময় দলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পদৰেপ নিয়েছিলেন এবং দলের নেতা হিসেবে শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দিতে জোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন। জরম্নরী অবস্থার সময় ডিজিএফআইর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকার কারণে সাবের হোসেন চৌধুরী ও আসাদুজ্জামান নূরকেও নিষ্ক্রিয় রাখেন শেখ হাসিনা।
তারবার্তায় বলা হয়, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার অতি বিশ্বসত্ম গওহর রিজভীকে উপদেষ্টা বানানো হয় তাঁর ছেলে জয়কে হার্ভার্ডের কেনেডি স্কুলে ভর্তি করানো এবং শেখ হাসিনার মুক্তির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রে মইন উ আহমেদের সঙ্গে আলোচনা করার কারণে। আর শেখ হাসিনার কতর্ৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার ৰেত্রে দিলীপ বড়ুয়াকে কম হুমকি বলেই বাম দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার বাদ দিয়ে তাঁকে (দিলীপ বড়ুয়া) শিল্পমন্ত্রী করা হয় বলেও উলেস্নখ করা হয় মার্কিন তারবার্তায়।
অপরদিকে খালেদা জিয়ার কাছের লোকদের দুর্নীতির তথ্যও ফাঁস করে দিয়েছে উইকিলিকস। মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রেরিত গোপন তারবার্তায় প্রকাশ পেয়েছে- বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সরকারের সিদ্ধানত্ম গ্রহণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন মাত্র গুটিকয়েক ব্যক্তি। প্রাতিষ্ঠানিক পদবি ও অবস্থানের চেয়ে তাঁর প্রতি আনুগত্য ও তাঁর কাছাকাছি যাঁরা ছিলেন তাঁদের ওপরই বেশিনির্ভর ছিলেন। সমালোচকরা খালেদা জিয়াকে অলস, অশিৰিত বলে অভিহিত করে এবং তিনি কানকথা বেশি শুনেন বলেও উলেস্নখ করা হয় তারবার্তায়।
খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান সম্পর্কে ঢাকায় সর্বশেষ মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি তাঁর দেশকে লিখেছেন, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান জিয়াউর রহমানের কুখ্যাত বড় ছেলে এবং মায়ের উত্তরসূরি। ‘ভয়ঙ্কর রাজনীতিক এবং দুর্নীতি ও চুরির মানসিকতাসম্পন্ন সরকারের প্রতীক’ উলেস্নখ করে তাঁকে (তারেক রহমান) বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থের প্রতি হুমকি হিসাবেও দেখানো হয়। তারেক রহমানের বিরম্নদ্ধে ৰমতায় থাকাকালে দুর্নীতির বিনিময়ে দেশের মন্ত্রিত্ব বিক্রির অভিযোগ করা হয়। তারবার্তায় বলা হয়, তারেক রহমান খুবই নির্দয়, দুনর্ীতিগ্রসত্ম, একাডেমিক পড়াশোনার অবস্থাও খুব ভাল নয়, রাজনীতিতে অপরিপক্ব। ‘হাওয়া ভবন’ নামে একটি বাসা থেকে তিনিই মূলত সরকারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতেন। ওই ভবনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল তার ছায়া সরকার। মার্কিন কোম্পানি সিমেন্সের কাছে ঘুষ গ্রহণসহ তারেক রহমানের বিরম্নদ্ধে দায়েরকৃত কয়েকটি মামলার সংৰিপ্ত সার তুলে ধরে তারবার্তায় বলা হয়, এক প্রত্যৰদর্শী তারেক ও তার ভাই কোকোর কাছে সিমেন্সের কাছ থেকে নেয়া ঘুষ পেঁৗছে দেন।
খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সম্পর্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পাঠানো তারবার্তায় বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী মূলত ‘সব কাজের কাজী’। পাকিসত্মানপন্থী রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেয়া সাকা চৌধুরীর বিরম্নদ্ধে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। সমালোচকদের চোখে তিনি (সাকা চৌধুরী) ধর্ষক, অস্ত্র ব্যবসায়ী ও খুনী। চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় তাঁর বিরম্নদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ ইস্কান্দার সম্পর্কে বলা হয়, তারেক রহমানের সঙ্গে তার যৌথ ব্যবসা রয়েছে। সামরিক বাহিনীর ক্রয়সংক্রানত্ম চুক্তি এবং উর্ধতন পদে নিয়োগের ৰেত্রে প্রভাব বিসত্মার করে থাকেন।
বিএনপি নেতা খোন্দকার মোশাররফ হোসেন সম্পর্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পাঠানো তারবার্তায় উলেস্নখ রয়েছে, তিনি খালেদা জিয়ার অন্যতম আস্থাভাজন। তবে অতিমাত্রায় দুনর্ীতিগ্রসত্ম। তিনি একজন সুবিধাভোগীও বটে। খালেদা জিয়ার প্রথম দফার শাসনামলে জ্বালানিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। চীনের সঙ্গে কয়লা উত্তোলন চুক্তি স্বাৰরে তার সংশিস্নষ্টতা ছিল। জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী সম্পর্কে বলা হয়, মন্ত্রী থাকাকালে তাঁর লৰ্য ছিল জামায়াতে ইসলামীর জনপ্রিয়তা বাড়ানো এবং আগামী ২৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করা। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী সম্পর্কে বলা হয়, তিনি বিরোধী দলের ওপর সহিংস কর্মকাণ্ড চালাতে পারদর্শী। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে চোরাচালানী, তারেক জিয়ার বিশ্বস্ত জামায়াতপন্থী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here