রেলের গতি ধীর অতি

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রেলগাড়ির যাতায়াত নিয়ে যা দৃশ্যমান; তাতে যাত্রীরা বেশ হতাশ ও উদ্বিগ্ন! রেললাইনের নড়বড়ে অবস্থা, দুর্ঘটনা, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা, যাত্রীসেবার মান, পরিচালনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের ফি বছর ক্ষতি- এসব ক্ষেত্রে শুধুই হতাশা! মৌলভীবাজারে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় খোদ মন্ত্রীর অগ্রহণযোগ্য মন্তব্যও বেশ হাস্যকর!

নিরাপদ যাত্রায় রেলগাড়িতে ভ্রমণ এখন যেন স্বপ্ন! অথচ গণপরিবহনে এর বিকল্প নেই। বাংলাদেশ রেলওয়ে নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। মানুষের গতি বেড়ে গেলেও দেশে রেলগাড়ির গতি কমে গেছে! রেলমন্ত্রী ভারত ঘুরে এসেছেন! এ সফর ছিল তার ভারত রেলওয়ের ব্যবস্থাপনা দেখার জন্য। তার মানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যবস্থাপনা যে সুষম নেই, তা তিনি পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন।

মৌলভীবাজারে সাম্প্রতিক রেল দুর্ঘটনার পর মন্ত্রীর বেফাঁস বক্তব্য প্রায় সবার কাছেই হাসির উদ্রেক করেছে। টিকিট নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ছাড়াও ঈদুল আজহায় অপেক্ষমাণ ঘরমুখো যাত্রীদের হঠাৎ যাত্রায় বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন বাতিলের সিদ্ধান্ত সারা দেশের মানুষকে বিস্মিত করেছে। ক্ষমতার ১১ বছর পর এসে রেললাইনের বেহাল ও অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে রেলমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি সরকার রেলের কোনো উন্নয়ন করেনি।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ রেলওয়ের ওপর দুটি ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ হয়েছে। সরকারের তৈরি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক জরিপ-২০১৯-এর একটি, অপরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রাপ্ত ভিডিও ক্লিপ। দুটি চিত্রই উপাত্ত ও পরিসংখ্যানভিত্তিক। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে পারিবারিকভাবে খুলনা ও সিলেটে আন্তঃনগর ট্রেনে ভ্রমণ করেছি; অভিজ্ঞতা মোটেও ভালো নয়। অথচ সেবা খাতের এ বিভাগটিকে ভালো করার বেশ সুযোগ রয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে পরিচালিত দেশের রেল লাভজনক পর্যায়ে নেই দীর্ঘকাল থেকে। অথচ সরকারি হিসাবে প্রতিবছরই রেলগাড়িতে যাত্রী পরিবহনের সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেখা যায়, কিলোমিটার হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রী পরিবহন প্রতিবছরই বাড়ছে। অর্থবছর অনুযায়ী রেলওয়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৮১৩৪.৭০, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৮৭১১.৩৬, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯১৬৭.১৮, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১০০৪০.৬৬ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১২৯৯৩.৯১ মিলিয়ন যাত্রী পরিবহন করেছে।

২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট লোকসান ১০ হাজার ৫৫৯ দশমিক ০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের হিসাব সাময়িক। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব আয় হয়েছিল ১৩০ দশমিক ৩৭ কোটি টাকা। আর ব্যয় খুবই আশঙ্কাজনক। আয়ের চেয়ে ব্যয় ২০ গুণেরও বেশি; অর্থাৎ ২ হাজার ৮৩৫ দশমিক ৫২ কোটি টাকা। আমাদের রেলের গতি বেশ শ্লথ হয়ে পড়লেও ব্যয়ের গতি বেশ দ্রুততর।

২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল অবধি ৭ বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের পেছনে ব্যয় হয়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা। রেলের চলমান ৪৮টি উন্নয়ন প্রকল্পে ২০১৮ সাল অবধি মোট ব্যয় হয়েছে ৯৮ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেল মন্ত্রণালয়ে ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এ সময় মন্ত্রণালয়ে ১৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে ১২ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা উন্নয়ন ব্যয় এবং ৩ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা কার্যক্রম ব্যয়ে বরাদ্দ রাখা হয়।

জাতীয় বাজেটে প্রতিবছরই বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যয় বাড়ছে; কিন্তু ব্যয়ের তুলনায় আয় বৃদ্ধি পায় না যেমন; তেমনি বাড়ছে না যাত্রীসেবার মান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রেলের লাভ-ক্ষতি নিয়ে তথ্য ও পরিসংখ্যানভিত্তিক একটি ভিডিও ক্লিপ আপলোড করা হয়েছে- যা ক’দিন আগে ভাইরাল হয়। সজীব নামের বেশ বুদ্ধিদীপ্ত ২২-২৩ বছরের এক তরুণ কথা ও প্রদর্শিত উপাত্ত দিয়ে বাংলাদেশের রেল পরিবহন ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন।

তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে বলেছেন, কোনোভাবেই রেলের লোকসান হতে পারে না! সজীব সরল অঙ্ক বিশ্লেষণ করে বলেছেন- দেশে প্রতিদিন চলাচলকারী যাত্রীবাহী রেলগাড়ির সংখ্যা ২৩৫টি, যাত্রী সংখ্যা গড়ে ১৫০০ এবং যাত্রীপ্রতি গড়ে ভাড়ামূল্য ৩০০ টাকা; তাহলে বাংলাদেশ রেলওয়ের দৈনিক আয় হয় ১০ কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তার মতে, এ হিসাবে প্রতিদিন রেলওয়ের ১০ কোটি টাকা আয় হলে মাসে ৩০০ কোটি এবং বছরে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আয় হয়।

বাংলাদেশ রেলওয়ের দেয়া উপাত্ত অনুযায়ী রেল পরিবহন পরিচালনায় বছরে ব্যয় ৩ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। সে হিসাবে রেলওয়ের বছরে লাভ ৪৫৮ কোটি টাকা। সজীব বলেছেন, ভারতে এক কিলোমিটার রেলপথ তৈরি করতে ব্যয় হয় ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশে খরচ হয় ২৫০ কোটি টাকা! ভিডিও ক্লিপে বিষয়টি উপস্থাপন করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে ‘নাস্তা পানি’ খাওয়ানোর জন্য সরকারকে অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, এটি করা হলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার মান কেমন? ঢাকা থেকে সিলেট যাত্রায় ও ঢাকায় ফিরে আসার জন্য পারাবত এবং খুলনায় সুন্দরবন এক্সপ্রেসে আমাদের ভ্রমণ মোটেও সুখকর ও আনন্দদায়ক ছিল না। উভয় বিভাগীয় নগরে যেতে আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য প্রথম শ্রেণির তাপানুকূল কামরায় টিকিট যাত্রার দশ দিন আগে থেকেই নেই। এসব আন্তঃনগর এক্সপ্রেসে ভ্রমণ করতে গিয়ে দেখেছি, নির্ধারিত স্থান ছাড়া গাড়ি থামানো, আসন ছাড়া যাত্রী কখনও কখনও বিনা টিকিটের যাত্রীদের শূন্য আসনে বসে পড়া এবং হকারদের উৎপাত।

টিকিটের গায়ে যাত্রা ও গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর সময় রীতিমতো অকার্যকর। শৌচাগার অপরিষ্কার, সেখানে অপর্যাপ্ত পানি ও দুর্গন্ধ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, কামরার পাখা, বাতি ও সুইচ বোর্ড বিকল চোখে পড়েছে। দ্বৈত লাইন না থাকায় অন্য গাড়িকে পারাপারের সুযোগদানে নির্ধারিত সময়ে যাত্রীদের গন্তব্যে না পৌঁছার বিড়ম্বনা তো রয়েছেই! তাছাড়া গাড়ি পুনঃচলাচলে স্টেশন মাস্টারদের সময়ক্ষেপণ ও স্বেচ্ছাচারিতার নজির লক্ষণীয়।

বাংলাদেশ রেলওয়ের লাভ না হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাই না আমিও। জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটির আয়-ব্যয়ের হিসাব বিশেষভাবে সরকারের খতিয়ে দেখা অবশ্যই জরুরি। চারদলীয় বিএনপি জোট সরকারের সময় ২০০৩ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় একটি রিকভারি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। সংস্কার বিষয়ে ৫টি কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম প্রধান ২টি উপাদান ছিল রেলওয়ের ঘাটতি কমানো এবং শ্রমিক সুষমকরণ। সে কার্যক্রম এখন আর নেই। সেই রিকভারি কার্যক্রম পুনরায় গ্রহণ প্রয়োজন।

দেশের জরাজীর্ণ রেলব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশনায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত প্রায় এক দশকে একের পর এক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় ২০১১ সালে পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দুই মেয়াদে তিনজন মন্ত্রী হাল ধরেছেন এ মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু বেগতির রেলে গতি আর আসছে না।

বছর বছর বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যয়ের হার বাড়ে; কিন্তু বৃদ্ধি পায় না সেবার মান ও মুনাফা। সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার। কেননা, বাংলাদেশ রেলওয়েতে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি যে নেই; তা তথ্য, উপাত্ত এবং পরিসংখ্যান কিন্তু বলে না! তাই আমরা চাই, সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেলওয়ের দ্রুত গতি; চাই না আর রেলের ক্ষতি।

প্রণব মজুমদার : গল্পকার ও কবি, পাক্ষিক অর্থ কাগজের সম্পাদক

reporterpranab@gmail.com

Photo Gallery

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সাহিদুর রহমান,অফিসঃ ২২/১, তোপখানা রোড (৫ম তলা) বাংলাদেশ সচিবালয়ের উত্তর পার্শ্বে, ঢাকা-১০০০।
অফিস সেল ফোনঃ ০১৬১১-৯২০ ৮৫০, ই-মেইলঃ shiromoni67@gmail.com ,ওয়েবঃ www. Shiromoni.com

Social Widgets powered by AB-WebLog.com.