মূল্যায়নের প্রত্যাশায় সাম্যবাদী দল

‘ছোট দল’ হওয়ায় ক্ষমতাসীন জোট ও সরকারে অনেকটাই ‘গুরুত্বহীন’ হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)। আগের দুটি নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জোটগতভাবে ভোটের মাঠে ছিল দলটি। তবে আসন সমঝোতার সময় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক এই দলটিকে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে। তবে গত দেড় দশকে জোট রাজনীতি করে দলীয় প্রধান দিলীপ বড়ূয়া এক মেয়াদে মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পান।

এ অবস্থায় রাজনীতির মাঠে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে নানা কর্মসূচি নিয়ে তৎপর থাকার চেষ্টা করছে সাম্যবাদী দল। আগামী বছরের শেষ নাগাদ দলের জাতীয় কংগ্রেস (সম্মেলন) আয়োজনের মাধ্যমে দল গোছানোর পরিকল্পনাও করছেন নেতারা। পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটে আরও ‘কার্যকর ভূমিকা’ পালনের আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে তাদের।

সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ূয়া সমকালকে বলেন, ছোট দল কিংবা বড় দল বিষয় নয়। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ২৩ দফার ভিত্তিতে ২০০৫ সালে ১৪ দল গঠনের সময় তাদের প্রয়োজনীয়তা যেভাবে ছিল, তা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। এদেশের রাজনীতিতে ১৪ দলের প্রাসঙ্গিকতা এখনও বিদ্যমান। কারণ সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী অপশক্তি দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এখনও সক্রিয়। এই অপশক্তির পুরোধা বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠীকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন ও পরাজিত না করা পর্যন্ত ১৪ দল এবং তাদের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাবে।

তিনি বলেন, একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতির আদর্শকে অনুসরণ করে তার দল। তাছাড়া তাদের একটা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পরিচিতি রয়েছে, যার বদৌলতে দেশি-বিদেশি অনেক সংকট মোকাবিলা করাও সম্ভব। এ অবস্থায় সাম্যবাদী দল তো বটেই, ১৪ দলের শরিক সবাইকেই যথাযথ মূল্যায়ন করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের দায়িত্ব। সেই মূল্যায়নটা করলে ভালো, না করলে তো কিছু বলার নেই।

১৯৬৭ সালের ১ অক্টোবর সাম্যবাদী দল (এম.এল.) প্রতিষ্ঠিত হয়। দলে মতবিরোধের জেরে মোহাম্মদ তোয়াহা, ‘কমরেড বশির’ নামে খ্যাত সুখেন্দু দস্তিদার এবং আবদুল হকের নেতৃত্বে একটি অংশ কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এম.এল.)’ নামে আলাদা দল গড়ে তোলে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে এই দলটির তৃতীয় কংগ্রেসে দলের নাম বদলে ‘সাম্যবাদী দল (এম.এল.)’ করা হয়। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ তোয়াহা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর আর কোনো সংসদেই প্রতিনিধিত্ব ছিল না দলটির। ১৯৮৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দিলীপ বড়ূয়া এখন পর্যন্ত দলটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের স্বৈরশাসন-বিরোধী গণআন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল দলটির। ১৯৯৮ সালের পর বেশ কয়েক বছর ‘১১ দল’ ও ‘বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ নামে দু’টি বাম প্রগতিশীল জোটের শরিক হিসেবে কার্যক্রম চালায় তারা। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার বছর দুয়েক পর থেকেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জোটে যোগ দিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুগপৎভাবে অংশ নেয় সাম্যবাদী দলসহ ১১ দলের শরিকরা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের পর থেকে এই জোটের শরিক হিসেবে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় রয়েছে সাম্যবাদী দল।

গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে একটি আসনেও ছাড় পায়নি সাম্যবাদী দল। তবে ‘সাংগঠনিক শক্তিমত্তার বিচারে’ তিনটি নির্বাচনেই ছয়টি করে আসন চেয়েছিল তারা। অবশ্য ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুুশ বিজয়ের পর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি গঠিত সরকারের মন্ত্রিসভায় দিলীপ বড়ূয়া শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে ২০১৩ সালের শেষভাগে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হন তিনি। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও বিপুল বিজয়ের পর মহাজোট আরও দু’দফা ক্ষমতাসীন হলেও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই মেলেনি বামপন্থি এ দলটির।

দলের নেতারা বলছেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে অসাম্প্র্রদায়িক গণতান্ত্রিক দলগুলোর জোট হিসেবে ১৪ দল প্রতিষ্ঠাকালে সাম্যবাদী দল ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ভূমিকা রেখেছিল। জোটের লক্ষ্য ছিল, ‘একসঙ্গে আন্দোলন, একসঙ্গে নির্বাচন এবং একসঙ্গে সরকার গঠন করা’। তবে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর জোটের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৪ দলীয় শরিকদের তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। সরকারে ঠাঁই মেলেনি ১৪ দলের শরিক কারোই। বরং প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতারা জোট শরিকদের ‘বিরোধী দলের ভূমিকা পালন’ কিংবা ‘নিজেদের পায়ে দাঁড়ানো’র কথা বলে এক ধরনের ‘অবমূল্যায়ন’ই করেছেন।

একাদশ নির্বাচন পরবর্তী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সরকারের এমন ‘অবহেলা’ ও ‘অবমূল্যায়নে’ ১৪ দলের অন্য শরিকদের মতো সাম্যবাদী দলও ক্ষুব্ধ। এ অবস্থায় সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়িয়ে রাজনীতি ও জোটে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাচ্ছে দলটি। আগামী দিনগুলোতে কয়েকটি সাংগঠনিক কর্মসূচি পালনের পর আগামী বছরের শেষভাগে অনুষ্ঠেয় দলের নবম জাতীয় কংগ্রেসের প্রস্তুতি শুরু হবে। কংগ্রেসের আগেই দলের জেলা-উপজেলা ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। সারাদেশে ৪০টি জেলা ও ৮৫টি উপজেলায় সাম্যবাদী দলের কমিটি রয়েছে। এর বাইরে শ্রমিক আন্দোলন, বাংলাদেশ চাষী সমিতি, যুব আন্দোলন ও ছাত্র আন্দোলন নামে দলের কয়েকটি সহযোগী সংগঠনও রয়েছে দলটির।

বিশ্নেষকরা বলছেন, এক মেয়াদে সরকারের শরিকানা পেলেও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে খুব বেশি এগুতে পারেনি সাম্যবাদী দল। উল্টো ১৪ দলে যুক্ত হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় যোগদান নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের জেরে দু’দফা ভাঙনের কবলে পড়েছে দলটি। এর মধ্যে ২০১২ সালের জানুয়ারিতে দলীয় প্রধান দিলীপ বডুয়ার বিরুদ্ধে মহাজোট সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দলীয় আদর্শচ্যুত হওয়া এবং বারবার বলার পরও মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ না করার অভিযোগ এনে সাঈদ আহম্মেদের নেতৃত্বে একটি অংশ দল ছাড়ে। দলের ২১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে পলিটব্যুরোর তিনজনসহ নয় সদস্য ওই অংশে ছিলেন। পরে বিক্ষুব্ধ অংশটি সাম্যবাদী দল (এম.এল.) নামে আলাদা দল গঠন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলে যুক্ত হয়। এছাড়া দলের তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর সাধারণ সম্পাদক হারুন চৌধুরী দল থেকে বহিস্কৃৃত হয়ে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে একই নামে পৃথক আরেকটি দল গঠন করেন।

এর আগে দলীয় সিদ্ধান্ত ছাড়াই ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় দল থেকে বহিস্কৃৃত হন হারুন চৌধুরী। বর্তমানে হারুন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী দলের ওই অংশটি ‘গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য’ নামে আরেকটি বামপন্থি জোটে সক্রিয় রয়েছে। বিক্ষুব্ধ ওই দু’টি অংশ আলাদা দল গঠন করে রাজনীতির মাঠে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। তবে মূল দলটিকে সাংগঠনিকভাবে কিছুটা হলেও ‘দুর্বল’ অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে।

অবশ্য দিলীপ বড়ূয়া দলীয় নেতাদের অন্য দল গঠনকে ‘ভাঙন’ বলতে একেবারেই নারাজ। তিনি বলেন, সাবেক ‘ফ্রিডম পার্টি নেতা’ সাঈদ আহম্মেদ কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে অন্য যে গুটিকয়েক ব্যক্তি দল ছেড়েছেন, তারা কোনো অবস্থায়ই রাজনীতিবিদের পর্যায়ে পড়েন না। আর হারুন চৌধুরীকে তো ‘অপকর্ম করায়’ দল থেকে আগেই বহিস্কার করা হয়েছিল। কাজেই তাদের আলাদা দল গঠন সাম্যবাদী দলের সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর কোনো প্রভাব কিংবা দলকে বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্তও করতে পারেনি। বরং সাম্যবাদী দল আগের চেয়ে আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, শক্তিশালী হয়েছে।

Photo Gallery

সম্পাদক ও প্রকাশক : সাহিদুর রহমান, অফিস : ৪৫, তোপখানা রোড (নীচতলা)পল্টন মোড়, ট্রপিকানা টাওয়ার, ঢাকা-১০০০।
অফিস সেল ফোন : ০১৯১১-৭৩৫৫৩৩। ই-মেইল : shiromonimedia@gmail.com,ওয়েব : www.shiromoni.com

Social Widgets powered by AB-WebLog.com.