নিউজিল্যান্ডের রক্তপাতের পেছনেও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ

দেসঅনলাইন ডেস্ক : নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে জুমার নামাজের প্রস্তুতিরত  ৪৯ মুসল্লিকে হত্যার ঘটনায় এক অস্ট্রেলীয় তরুণ দায় স্বীকার করেছেন। ব্রেন্টন ট্যারান্ট নামে টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে এ দাবি করা হয় এবং এ অ্যাকাউন্ট থেকেই হত্যার ভিডিও লাইভ স্ট্রিমিং করা হয়। ব্রেন্টন একটি ইশতেহার, অনলাইনে প্রচার করেছেন, যেখানে অভিবাসন বিরোধিতা এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের কথা বলা হয়েছে। পরে অবশ্য অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলা হয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে, ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলাকারীরা চরম দক্ষিণপন্থী মতবাদে বিশ্বাসী এবং তারা অভিবাসীদের বিপরীতে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী।

এ ঘটনায় ক্রাইস্টচার্চ পুলিশ সন্দেহভাজন চারজনকে আটক করেছে। তাদের মধ্যে একজনকে আজ (শনিবার) আদালতে উপস্থাপন করা হবে। তবে এ তরুণ সেই ব্রেন্টনই কিনা, তা নিশ্চিত করা হয়নি। যদিও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন আটকদের একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছেন।

সিডনি মর্নিং হেরাল্ড জানিয়েছে, ব্রেন্টন অস্ট্রেলিয়ার গ্রাফটন শহরে বড় হয়েছেন। তিনি একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান বলেও জানা গেছে। শরীরচর্চা ও শিশুদের জন্য একটি অ্যাথলেটিক প্রোগ্রাম পরিচালনা করেন তিনি।

অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া ৭৪ পৃষ্ঠার ডসিয়ারটি ট্যারান্ট নিজেই লিখেছেন। ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ শিরোনামের ডসিয়ারে বলা হয়েছে, ‘একটি নতুন সমাজের দিকে আমরা এগিয়ে যাব।’ সেখানে ‘ব্যাপকভিত্তিক অভিবাসনের সংকট’ নিয়েও কথা বলা হয়েছে।

এ হামলাকে ‘ইউরোপীয় ভূমিতে অনুপ্রবেশকারী এবং লাখ লাখ ইউরোপীয়র দাসত্বের প্রতি প্রতিশোধ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের ‘ফরটিন ওয়ার্ডস’ শীর্ষক স্লোগানও যুক্ত করা হয়েছে—আমাদের অবশ্যই জনগণের অস্তিত্ব এবং শ্বেতাঙ্গ শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।

ডসিয়ারের প্রচ্ছদের একটি মনোগ্রামে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের আটটি মটো তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো সাম্রাজ্যবাদ বিরুদ্ধতা, পরিবেশবাদ, দায়িত্বশীল বাজার, মাদকাসক্তিমুক্ত সমাজ, আইনের শাসন, নৃগোষ্ঠীগত স্বায়ত্তশাসন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষা এবং শ্রমিকের অধিকার।

এ পুস্তিকায় ইসলামের ‘সহিংস’ উত্থানের কথাও উল্লেখ আছে। নরওয়ের গণহত্যাকারী ব্রেইভিকের সঙ্গে তার সংক্ষিপ্ত যোগাযোগ থাকারও ইঙ্গিত রয়েছে।

ব্রেন্টন নিজেকে অস্ট্রেলীয় দাবি না করলেও বলেছেন, আমার ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক বিশ্বাস, দর্শন, আত্মপরিচয় এবং সবচেয়ে বড় কথা আমার রক্ত হলো ইউরোপীয়। আমার মা-বাবা স্কটিশ, আইরিশ ও ইংলিশ রক্ত বহন করছেন। আমার একটি সাধারণ ও স্বাভাবিক শৈশব ছিল।

নিজের সম্পর্কে বলেছেন, শ্রমজীবী নিম্ন আয়ের একটি পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। সাধারণ পরিবারের একজন সাধারণ শ্বেতাঙ্গ। তার জনগণের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে তিনি এগিয়ে এসেছেন।

ইশতেহারে ব্রেন্টন দাবি করেছেন, তিনি কোনো খ্যাতির জন্য লালায়িত নন। তিনি আসলে একজন অন্তর্মুখী মানুষ। নিজেকে নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদী ও ফ্যাসিস্ট বলেও বর্ণনা করেন তিনি।

ব্রেন্টনের ইশতেহারে দেয়া তথ্যমতে, দুই বছর ধরে হামলার পরিকল্পনা করেছেন তিনি। তবে নিউজিল্যান্ডই প্রধান লক্ষ্য ছিল না। ক্রাইস্টচার্চের স্থানটি পরিকল্পনার তিন মাস আগেই বেছে নিয়েছেন।

হামলার জন্য স্থানটিকে বেছে নেয়ার কারণ ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নিউজিল্যান্ডে এসেছিলেন সাময়িক অবস্থান করে পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ নিতে। এসে বুঝতে পারেন পশ্চিমের যেকোনো স্থানের তুলনায় নিউজিল্যান্ডে হামলার উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে।

একই ধরনের চরমপন্থী মতবাদে বিশ্বাসী নরওয়ের তরুণ অ্যান্ডার্স বেরিং ব্রেইভিক ২০১১ সালের ২২ জুলাই বোমা বিস্ফোরণ এবং গুলি করে পৃথক স্থানে মোট ৭৭ জনকে হত্যা করেন। এ তরুণ মাত্র ২০ বছর বয়সে অভিবাসনবিরোধী ডানপন্থী প্রগ্রেস পার্টিতে যোগ দেন। হামলার দিন ব্রেইভিকও অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী ইশতেহার অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

ইউরোপ ও আমেরিকাজুড়েই এখন চলছে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী কর্মকাণ্ড। এর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করলে প্রথমেই উঠে আসে রবার্ট গ্রেগরি বাউয়ার্সের নাম। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের পিটসবুর্গে ইহুদি উপাসনালয়ে হামলা চালিয়ে প্রার্থনারত ১২ ইহুদিকে হত্যা করেন তিনি। এভাবে ২০১৭ সালে কুইবেক সিটিতে আলেজান্ডার বিসোনেট মসজিদের ছয় মুসলিমকে হত্যা করেন; ২০১৫ সালে সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লসটনে গির্জায় প্রার্থনায় অংশ নেয়া নয় কৃষ্ণাঙ্গ খ্রিস্টানকে হত্যা করেন ডিলান রুফ। তাদের সবার মোটিভ একই।

সাউদার্ন পভার্টি ল’ সেন্টার নামে আইন সহায়তাবিষয়ক আমেরিকান অলাভজনক একটি সংগঠন সম্প্রতি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের অসংখ্য ষড়যন্ত্রের তথ্য জানিয়েছে। অন্তত ৩০ হাজার মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল তাদের, যেগুলো মার্কিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নস্যাৎ করেছে বলে উল্লেখ করেছে তারা।

গত মাসেও ক্রিস্টোফার পল হ্যাসন নামে এক শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই)। মার্কিন কোস্টগার্ডের এ সাবেক লেফটেন্যান্ট কৃষ্ণাঙ্গ, প্রগতিশীল রাজনীতিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে জানানো হয়।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আর্ডার্ন এ ঘটনাকে সরাসরি ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। দিনটিকে নিউজিল্যান্ডের ‘কালো দিন’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন এ ঘটনাকে ‘চরমপন্থী ডান সহিংস সন্ত্রাসীর’ হামলা বলে বর্ণনা করেছেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, সিডনি মর্নিং হেরাল্ড, দ্য গার্ডিয়ান

Photo Gallery

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সাহিদুর রহমান,অফিসঃ ২২/১, তোপখানা রোড (৫ম তলা) বাংলাদেশ সচিবালয়ের উত্তর পার্শ্বে, ঢাকা-১০০০।
অফিস সেল ফোনঃ ০১৬১১-৯২০ ৮৫০, ই-মেইলঃ shiromoni67@gmail.com ,ওয়েবঃ www. Shiromoni.com

Social Widgets powered by AB-WebLog.com.